ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি মোড় থেকে দোয়েল চত্বর পর্যন্ত ২০টি ল্যাম্পপোস্টে বাতি জ্বলে না। আগারগাঁও ক্রসিং থেকে নতুন রাস্তা দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সংলগ্ন সড়কে কমপক্ষে ১৪টি ল্যাম্পপোস্টে বাতি নেই। আবার মিরপুর ১ নম্বর সেকশন থেকে ২ নম্বর পর্যন্ত ও ২ নম্বর হয়ে চলন্তিকা মোড় দিয়ে ১১ নম্বর বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত আটটি ল্যাম্পপোস্টে বাতি নেই। মিরপুরের শেরেবাংলা ক্রিকেট স্টেডিয়ামের পাশ দিয়ে যাওয়া রাস্তাটির বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। খিলগাঁও রেলগেট থেকে মালিবাগ হয়ে রামপুরা ব্রিজ পর্যন্ত ২২টি ল্যাম্পপোস্টে বাতি জ্বলে না। কাকরাইলের প্রধান বিচারপতির বাসভবন থেকে মগবাজার মোড় পর্যন্ত চারটি পোস্টে বাতি নেই। একই অবস্থা সাতরাস্তা থেকে মহাখালী পর্যন্ত দুই পাশে অন্তত ২৫টি ল্যাম্পপোস্টের। সেগুলোতেও বাতি জ্বলে না দীর্ঘদিন। ল্যাম্পপোস্টে বাতি না থাকায় এভাবে রাজধানীর বেশ কিছু এলাকায় সন্ধ্যা নামলেই গুরুত্বপূর্ণ রাস্তাগুলো অন্ধকারে ডুবে যায়। দোকান আর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের আলোতে রাতের প্রথমভাগে সড়ক কিছুটা আলোকিত থাকলেও দোকানপাট বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব এলাকায় নামে অন্ধকার। এ সুযোগে ছিনতাইসহ নানা অপকর্ম করে নির্বিঘ্নে পালিয়ে যায় অপরাধীরা।
অথচ সড়ক বাতির জন্য ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বার্ষিক বাজেটে দেওয়া হয় পর্যাপ্ত অর্থ। তবে বরাদ্দ অর্থের আংশিক সড়কে খরচ করে বাকিটা ভাগবাটোয়ারা করে নেয় সংশ্লিষ্ট লোকজন। বছরের পর বছর ধরে সিটি করপোরেশনের সড়ক বাতির নামে চলছে এ লুটপাট।
জিগাতলা এলাকার ব্যবসায়ী আরাফাত ইসলাম ভূঁইয়া বললেন, জিগাতলা বাসস্ট্যান্ড থেকে ট্যানারি মোড় পর্যন্ত সড়কে ২৬টি সড়ক বাতির মধ্যে মাত্র ১০টি সচল। এগুলোর মধ্যে আবার ছয়টিতে লাগানো হয়েছে বিদুৎ সাশ্রয়ী (এনার্জি) বাতি। আর চারটিতে আছে সোডিয়াম বাতি। আবার জিগাতলা মিষ্টির দোকান মোড় থেকে ট্যানারি মোড় পর্যন্ত সড়কে ১৮টি সড়ক বাতির মধ্যে মাত্র ছয়টি সচল, এর মধ্যে একটি সোডিয়াম বাতি। বাকিগুলো এনার্জি বাতি। এ সড়কে দোকানও কম। পর্যাপ্ত আলো না থাকায় তাই সন্ধ্যা হলেই নামে অন্ধকার। সেই সঙ্গে মাদকসেবী ও ছিনতাইকারীদের আনাগোনাও বাড়ে।
এ ব্যাপারে উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বি এম এনামুল হক বললেন, 'যেকোনো অনিয়ম-দুর্নীতির ব্যাপারে আমাদের অবস্থান 'জিরো টলারেন্স'। যেসব সেক্টরে অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে সেখানে তদন্ত করে ব্যবস্থা নিচ্ছি। এ (বাতি) বিষয়েও খোঁজ-খবর নিয়ে পরবর্তী ব্যবস্থা নেব।'
জানা গেছে, ঢাকার প্রতিটি সড়কের ল্যাম্পপোস্টে এনার্জি সেভিং বাল্ব ও সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের মাধ্যমে এনার্জি বাল্ব লাগানোর কথা থাকলেও তা আংশিক কার্যকর হয়েছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ভুয়া ভাউচারের মাধ্যমে তা কাগজ-কলমে দেখিয়ে দিচ্ছেন। চলতি অর্থবছরে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে দক্ষিণ সিটির বরাদ্দ ৬৮ কোটি ৯৯ লাখ টাকা। আর উত্তর সিটির জন্য বরাদ্দ ৪৬ কোটি ২৫ লাখ টাকা। তবে যথেষ্ট অর্থ বরাদ্দ থাকলেও অন্ধকার সড়কগুলো আলোকিত হয়নি। বছরের পর বছর ধরে ভুয়া ভাউচার আর গোপন টেন্ডারের মাধ্যমে চলে লুটপাট। দুই করপোরেশনেই ক্রয়ের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা, ১০ আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা ও বিদ্যুৎ প্রকৌশলীদের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে সিন্ডিকেট। করপোরেশনের ছোট-বড় কর্মকর্তা-কর্মচারী থেকে শুরু করে এলাকাভিত্তিক ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী ব্যক্তিও রয়েছে সিন্ডিকেটে। করপোরেশনের মনিটরিং না থাকায় সড়ক বাতির নামে লুটপাট চললেও তা দেখার কেউ নেই। কয়েক দিন ঘুরে রাজধানীর বেশ কিছু ব্যস্ততম সড়কে দেখা গেছে ল্যাম্পপোস্টে বাতি জ্বলে না। এর মধ্যে ফার্মগেট থেকে তেজতুরীপাড়া যেতে সড়কের পূর্বদিকে রাস্তার অধিকাংশ বাতি জ্বলে না। সাতরাস্তার মোড় থেকে ফার্মগেট যাওয়ার রাস্তাটিরও একই অবস্থা। কাকরাইলের আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের সামনের সড়কের অনেক পোস্টে বাতি নেই। মালিবাগ রেলগেট থেকে রামপুরা পর্যন্ত মূল সড়কটির অবস্থাও একই। ওয়াপদা রোড, হাজীপাড়া, মালিবাগ চৌধুরীপাড়ায়ও বেশির ভাগ এলাকায় সড়কের অধিকাংশ বাতি নেই। একই অবস্থা খিলক্ষেত, বনশ্রী, যাত্রাবাড়ী, কমলাপুর, মানিকনগর, মতিঝিল, গোপীবাগ, লালবাগ, কোতোয়ালি, জুরাইন, গেণ্ডারিয়া, ধোলাইরপাড়, পোস্তগোলা, লক্ষ্মীবাজার, বাসাবো, মুগদা, চকবাজার, বাড্ডা, শহীদবাগ, গোড়ান, মিরপুর কাজীপাড়া, ইব্রাহীমপুর, পল্লবী, মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধ ও মিরপুর বেড়িবাঁধ সড়কেও অনেক ল্যাম্পপোস্টে বাতি নেই।
রাজধানীর বেশ কিছু রাস্তায় সিটি করপোরেশন সৌর বাতি লাগিয়েছে। কিন্তু মাত্র দুই বছর আগে নেওয়া এসব বাতি এখন খুব একটা কাজে আসছে না। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে এ প্রকল্পের আওতায় রাজধানীর কাকরাইল, আরামবাগ, বাংলামোটর, গুলশান, হাতিরঝিল, নাবিস্কো, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাসহ বিভিন্ন রাস্তায় এসব সৌর বাতি লাগানো হয়েছে। প্রাথমিকভাবে সফল হলে পর্যায়ক্রমে রাজধানীর অন্যান্য রাস্তায়ও প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কথা রয়েছে। কিন্তু সোলার প্যানেলের অধিকাংশ বাতি নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে। কোনো কোনো জায়গায় অল্প আলো জ্বললেও তা কোনো কাজে আসে না।
সড়ক বাতির অনিয়মের ব্যাপারে উত্তর সিটি করপোরেশনের আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা (অঞ্চল-৫) প্রণব কুমার ঘোষ বললেন, 'সোয়া ৪৬ কোটি টাকার পুরোটা বাতির জন্য না। এর বেশ কিছু অন্য কাজে ব্যবহার হয়ে থাকে। আমরা বাতি কিনি না। ভাণ্ডার থেকে এনে তা লাগিয়ে দিই। এ ক্ষেত্রে বড় ধরনের দুর্নীতির সুযোগ থাকে না। এর পরও কেউ যদি আমার অঞ্চলে বাতির ব্যাপারে অনিয়ম করে তা খতিয়ে দেখব।'
দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আনছার আলী খান কালের কণ্ঠকে বলেন, 'মেয়র মহোদয় সম্প্রতি ঘোষণা দিয়েছেন যে আগামী শবেবরাতের আগে প্রতিটি পোস্টে বাতি জ্বলবে। আমরা সেই পর্যন্ত অপেক্ষা করি। তবে, বাতি নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ এখনো আমার কানে আসেনি।'

Post A Comment: