বিশ্বকাপ ফাইনাল, মেলবোর্ন এবং একজন বাঁহাতি পেসার। ঘুরেফিরে তাই এলো ওয়াসিম আকরামের কথা। পাকিস্তানের এই সুলতান অব সুইং তো অবসরে গেছেন বহুদিন আগে, তাঁর স্মৃতি ফিরিয়ে আনলেন মিচেল স্টার্ক। আকরাম যেমন ইয়ান বোথামকে শূন্য রানে ফিরিয়ে দিয়ে শুরুতেই মনোবল ভেঙে দিয়েছিলেন, তেমনি ব্ল্যাকক্যাপ অধিনায়ক ব্রেন্ডন ম্যাককালামের স্টাম্পটা ভেঙে দিয়ে শুরুতেই প্রথমবার বিশ্বকাপ ফাইনালে নামা নিউজিল্যান্ডের বাকি ক্রিকেটারদের মনোবলটা নড়বড়ে করে দিয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়ার এই বাঁহাতি পেসার। এখানেই মিলের শেষ নয়, আকরামের মতো স্টার্কও বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ উইকেটশিকারি। আকরাম সেরা খেলোয়াড় হতে পারেননি, কিন্তু ব্যাটসম্যানদের রানতীর্থ হয়ে ওঠা বিশ্বকাপে ২২ উইকেট নেওয়া স্টার্ক সেরা খেলোয়াড়ও। পুরস্কার দেওয়ার সময় তাই উপস্থাপক মার্ক নিকোলাস তাঁকে বললেন আকরামের উত্তরাধিকার হিসেবে। কথাটায় একদমই আবেগের আতিশয্য নেই।

বিশ্বকাপের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর শচীন টেন্ডুলকারের কাছে টুর্নামেন্ট সেরা স্মারক হিসেবে হিউবলোটের লিমিটেড এডিশন টাইটেনিয়াম ঘড়িটা যখন স্টার্ক নিচ্ছেন, তখন নিশ্চয়ই মনে মনে ভেসে উঠেছিল অ্যালিসা হিলির মুখটা। চেনাজানাটা সেই ছোট্টবেলার বছর পাঁচেক ধরেই একসঙ্গে আছেন ইয়ান হিলির ভাইয়ের মেয়ে ও অস্ট্রেলিয়ার মহিলা দলের উইকেটরক্ষক অ্যালিসার সঙ্গে। অ্যালিসা মেয়েদের দলের হয়ে চারটি বিশ্ব শিরোপা জিতেছেন, এত দিন স্টার্কের একটাও ছিল না। ভালোবাসার মানুষের কাছে একটু ছোট হয়ে থাকতে কারই-বা ভালো লাগে! বিশ্বকাপ জেতার সঙ্গে সঙ্গে সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কারটা জিতে স্টার্ক এবার তো বুক ফুলিয়ে বলতে পারবেন, 'আমার তো সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কারটা আছে!' অবশ্য ধূমকেতুর মতো হুট করে বিশ্বকাপে তারকা হয়ে যাননি স্টার্ক। বয়সভিত্তিক দলের জন্য ট্রয় কুলি আর ক্রেইগ ম্যাকডারমটের কাছে যখন তালিম নিচ্ছিলেন একাডেমিতে, তখন থেকেই তাঁর মাঝে উজ্জ্বল সম্ভাবনার আলো। ওয়ানডে অভিষেকের পর সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে সময় নেননি বেশি, ক্যারিয়ারের প্রথম ১৭ ওয়ানডের ভেতরই তিনবার নিয়েছেন ইনিংসে ৫ উইকেট, এখন পর্যন্ত সব মিলিয়ে সেটা পাঁচবার। ইনিংসে ৪ উইকেট আছে ছয়বার। বিশ্বকাপে তো রীতিমতো দুর্ধর্ষ স্টার্ক!

উদ্বোধনী ম্যাচে একটু ম্লান ছিলেন, হয়তো বিশ্বকাপ খেলার উত্তেজনায়। নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে পরের ম্যাচটায় স্টার্ক হয়ে উঠলেন বিধ্বংসী। এই আসরের অন্যতম সেরা বোলিং তো বটেই, আর একটা ওভার বোলিং পেলে হয়তো অস্ট্রেলিয়াকে ম্যাচটা জিতিয়েই দিতে পারতেন! ক্যারিয়ার সেরা বোলিং করে ৬ উইকেট নিয়ে খুঁজে পাওয়া ছন্দটা স্টার্ক ধরে রেখেছেন বিশ্বকাপের শেষ পর্যন্ত। এরপর সবগুলো ম্যাচেই পেয়েছে ২ উইকেট করে আর স্কটল্যান্ডের সঙ্গে ম্যাচে শিকারসংখ্যা ছিল ৪। ভারতের বিপক্ষে সেমিফাইনালে তো প্রায় ৯ ওভার বল করে মাত্র ২৮ রান দিয়েছিলেন স্টার্ক। রানবন্যার এই বিশ্বকাপেও গোটা আসরে গড়ে ওভারপ্রতি সাড়ে তিন রানের বেশি দেননি স্টার্ক। প্রতিটি উইকেটের জন্য খরচ হয়েছে গড়ে ১১ রানেরও কম আর প্রতি তিন ওভারেরও কমে একটি করে উইকেট নিয়েছেন। মোট ৬৩.৫ ওভার বল করেছেন, ৩টি ছিল মেডেন আর রান দিয়েছেন মাত্র ২২৪! আকরামের মতো সুইংয়ের বিষ আর গতির ঝড় তো আছেই, সঙ্গে যোগ হয়েছে জোরালো বাউন্সার দিতে পারার সামর্থ্য। সব মিলিয়েই এই মুহূর্তে ওয়ানডে র‌্যাংকিংয়ের এক নম্বর বোলার মিচেল স্টার্ক। সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার নিতে এসে হাসি সরছিল না তাঁর মুখ থেকে, তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বললেন, 'নিউজিল্যান্ড আসলে মানটা বেঁধে দিয়েছিল, আর আমরা সেটাকে পূর্ণতা দিয়েছি। বেশ কয়েক মাস আগে আমরা একসঙ্গে বসে একটা পরিকল্পনা করেছিলাম, সেটা বাস্তবায়নে আমরা অনেক কষ্ট করেছি। ক্রেইগ (ম্যাকডারমট) আমাদের নিয়ে যে ছকটা এঁকেছিল, সেটা বাস্তবে রূপ নিতে দেখে খুব ভালো লাগছে। আর ভাগ্যও কিছুটা সঙ্গে ছিল আমার। সব মিলিয়ে অসাধারণ অনুভূতি, এখন এটা উপভোগ করতে চাই।'

সীমিত ওভারের খেলায় ছড়ি ঘোরান ব্যাটসম্যানরাই, সেখানে বিশ্বকাপের ফাইনালের ম্যাচসেরা ও টুর্নামেন্ট সেরা দুজন বোলার। ব্যাপারটাকে বোলারদের কঠোর পরিশ্রমের ফসল বলেই বলছেন স্টার্ক, 'বলকে ব্যাট শাসন করছে, এটা দেখাটা বেশ আনন্দের। তবে অস্ট্রেলিয়ান দৃষ্টিভঙ্গিতে যেটা বলতে পারি, এটা আসলে বোলিং নিয়ে আমাদের কঠোর পরিশ্রমের ফসল, শুধু বিশ্বকাপের জন্যই নয় আগামীর জন্যও। আমাদের সব বোলাররাই ভালো করেছে। মিচেল মার্শ প্রথম ম্যাচে পাঁচ উইকেট নিল, ফকনারও আজ নিল তিনটা। সেমিতে জনসনও তিন উইকেট নিয়েছিল, সব মিলিয়ে আমাদের বোলিং ইউনিটটা অসাধারণ।'

সীমিত ওভারের খেলায় বোলাররা হয় রান আটকান অথবা উইকেট নেন, স্টার্ক করেন দুটোই! কিভাবে পারেন সেই প্রশ্নের উত্তরে স্টার্ক বললেন দলীয় প্রচেষ্টার কথা, 'এতে একটু ভাগ্যের ছোঁয়া হয়তো আছে, তবে আমি যেটা মনে করি আমাদের বোলাররা একে অন্যের পরিপূরক। আমাদের কোনো বোলার আছে যে সুইং করাতে পারে, কেউ গতির ঝড় তুলতে পারে, জনসনের বলে দারুণ বৈচিত্র্য আছে। আমরা আসলে সব কিছুই সামাল দিতে পারি। তাই কৃতিত্বটা আমি গোটা বোলিং আক্রমণকেই দেব।' অকল্যান্ডে গ্রুপ পর্বের ম্যাচের পর ব্রেন্ডন ম্যাককালামের ব্যাটিং নিয়ে হয়েছে ভিডিও বিশ্লেষণ, বোলিং কোচ ম্যাকডারমট বোলারদের নিয়ে বানিয়েছেন ছক। সেই চক্রবূহ্যেই আটকে গেছেন কিউই অধিনায়ক, এমনটাই শোনা গেল স্টার্কের কাছে, 'ম্যাককালাম খুবই অপ্রত্যাশিত কিছু করে ফেলে। আমরা তার ভিডিও দেখেছি, তাকে নিয়ে আমার আর ক্রেইগের একটা পরিকল্পনা ছিল। শুরুতেই গতি আর ইয়র্কারে তাকে ঘাবড়ে দেওয়া। প্রথম বলটা সে কিভাবে বেঁচে গেল আমি জানি না, (স্টামপের খুব কাছ ঘেঁষে বেরিয়ে যায়) ভাগ্য ভালো যে তৃতীয় বলটা লেগে যায়। আমি একটি ভাগ্যের ছোঁয়া পেয়েছি বটে, তবে কৌশলটা কাজে দিয়েছে।' ট্রফি হাতে নেওয়ার সময় ক্লার্ক বলেছিলেন, ফিল হিউজের প্রতি শিরোপা উৎসর্গ করার কথা। দুজনেরই নিউ সাউথ ওয়েলসের, দুজনেরই বয়স পঁচিশের কোটায়, যদিও হিউজ আটকে থাকবেন পঁচিশেই। কালো আর্মব্যান্ড পরে খেলাটা হিউজের জন্যই, জানালেন স্টার্ক, 'ওই ঘটনার পর আমি ও ক্লার্ক এটা ছাড়া কখনো মাঠে নেমেছি বলে মনে পড়ে না। এটা আমার ব্যক্তিগত একটা ভালো লাগার ব্যাপার, ওর চলে যাওয়ার পর টেস্ট সিরিজে আমরা কালো রিস্টব্যান্ড পরে খেলেছিলাম। সিরিজ শেষ হলেও আমি এটা চালিয়ে যেতে চেয়েছি। সে আমাদের বিশ্বকাপ দলেরই একজন, তাঁকে কখনো ভুলব না।' কণ্ঠ ভারী হয়ে আসা স্টার্ককে দেখে তখন মনে হয় না, এই মানুষটাই নিউজিল্যান্ড সমর্থকদের উৎসব মাটি করে দিয়েছেন ঘণ্টাখানেক আগেই।

স্টার্ক তাই হয়ে ওঠেন অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটারদেরই প্রতিচ্ছবি। মাঠে কট্টর পেশাদার, সাফল্যের জন্য নির্মম। তবুও প্রতিপক্ষের জন্য শ্রদ্ধা আর সতীর্থের পাশে সব সময়। ৩৫টা সেঞ্চুরি যাঁর দুটো আবার ডাবল এবং ৪৫০টা ছক্কায় ব্যাটসম্যানদের রানতীর্থে একজন বোলারকে টুর্নামেন্ট সেরা হতে গেলে অতিমানবীয় কিছু করতে হয়। সেই অতিমানব স্টার্ককেই আবার সংবাদ সম্মেলনে মনে হয় রক্ত-মাংসের মানুষ। মাঠে এবং মাঠের বাইরের পার্থক্যটা ঠিকঠাক গড়তে পারে বলেই হয়তো অস্ট্রেলিয়ানদের সাফল্য এত বেশি!

Post A Comment: